শুক্রবার, ৮ এপ্রিল, ২০২২

পুরুষ—কৃষ্ণ ৷৷ প্রকৃতি—রাধা

 পুরুষ—কৃষ্ণ ৷৷ প্রকৃতি—রাধা
=======================



যোগেনাত্মা সৃষ্টিবিধৌ দ্বিধারূপো বভূব সঃ ৷
পুমাংশ্চ দক্ষিণার্ধাঙ্গো বামাঙ্গঃ প্রকৃতিঃস্মৃতঃ৷৷
                                   (ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ, প্রকৃতিখণ্ড, ১/৮)
—পরমাত্ম স্বরূপ সেই ভগবান্ সৃষ্টিকার্য্যের নিমিত্ত যোগাবলম্বন করে নিজেকে দুইভাগে বিভক্ত করেন ৷ ঐ দুইভাগের দক্ষিণ অর্ধাঙ্গ পুরুষ এবং বাম অর্ধ প্রকৃতিরূপে আবির্ভূত হয় ৷

স্বেচ্ছাময়স্যেচ্ছয়াচ শ্রীকৃষ্ণস্য সিসৃক্ষয়া।
সাবিবর্ভূব সহসা মূলপ্রকৃতিরীশ্বরী।।১১।।
তদাজ্ঞয়া পঞ্চবিধা সৃষ্টিকর্মণি ভেদতঃ।
অথ ভক্তানুরোধাদ্বা ভক্তানুগ্ৰহ বিগ্রহা।।১২।।
গণেশমাতা দুর্গা যা শিবরূপা শিবপ্রিয়া।
নারায়ণী বিষ্ণুমায়া পূর্ণব্রহ্মস্বরূপিণী ।।১৩।।
                            (ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ, প্রকৃতিখণ্ড, ১/১১-১৩)
অর্থাৎ– সেই ইচ্ছাময় শ্রীকৃষ্ণের যখনি সৃষ্টির ইচ্ছা বলবতী হয়, তখনি সৰ্ব্বেশ্বরী মূল প্রকৃতি সহসা আবিভূত হইয়া থাকে ।। ১১।।
তৎপরে সৃষ্টি কাৰ্যের আবশ্যক হইলে সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অজ্ঞানুসারে ঐ মূল প্রকৃতি পঞ্চ প্রকারে বিভক্ত হইয়া উঠেন, অথবা ভক্তজনের মনােবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করিবার নিমিত্ত তাহাদিগের ইচ্ছামত পঞ্চবিধ রূপ ধারণ করেন ।।১২।।
যিনি গণেশজননী দুর্গা, তিনি শিবরূপিণী শিবের প্রিয়তমা পত্নী, তিনিই নারায়ণী এবং তিনিই পূর্ণব্রহ্মরূপিণী বিষ্ণুমায়া ।।১৩।।

গণেশ জননী দুর্গা রাধা লক্ষীঃ সরস্বতী ৷
সাবিত্রী চ সৃষ্টিবিধৌ প্রকৃতিঃ পঞ্চধাস্মৃতা ৷৷
                                   (দেবীভাগবত ৯/১/১)
অর্থ্যাৎ— যিনি বেদাদি সর্ব্ব শাস্ত্রেই ত্রিগুনসাম্যাবস্থা পরব্রহ্মরুপিনী প্রকৃতি নামে খ্যাত সেই পরা প্রকৃতিই সৃষ্টিসময়ে দূর্গা, রাধা, লক্ষী, সরস্বতী, সাবিত্রী এই পঞ্চমূর্তিতে আর্বিভূত হন।

বেদে বলা হয়েছে,— “সৃষ্টির প্রাগবস্থায় পুরুষ পরমেশ্বরের পত্নীরূপ প্রকৃতি পরমেশ্বর প্রদত্ত বীজ শক্তি গ্রহণ করে আর সংসর্গ প্রাপ্ত হয় ৷ সৃষ্টিক্রমের বিধাত্রী, পদার্থের উৎপাদিকা পুরুষরূপ পরমেশ্বরের পত্নী মহত্ব প্রাপ্ত হয় ৷ পরমৈশ্বর্যবান্ পরমেশ্বর সব পদার্থের মধ্যে সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট ৷” (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০/৮৬/১০, আর্য প্রতিনিধি সভা হতে প্রকাশিত ভাষ্য হতে অনূদিত)
ঋগ্বেদ সংহিতা ১০/৮৬/১০, আর্য প্রতিনিধি সভা


রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

বিষ্ণুর মোহিনী অবতার : দয়ানন্দীদের মুখে ঝামা ঘসা

 


 

 মোহিনী অবতার সাক্ষাৎ বিষ্ণু নয়, তা বিষ্ণুর বহিরঙ্গা মায়াশক্তির অবতার । মায়া বিষ্ণুর অংশ ও বিষ্ণুর অধিষ্ঠান বা ইচ্ছা বিনা মায়ার কর্ম-সামর্থ্য নাই । সুতরাং বিষ্ণু বিনা মায়ার স্বাতন্ত্র্যত্ব নাই, এজন্য মোহিনী অবতার সাক্ষাৎ বিষ্ণু না হলেও তাকে বিষ্ণুর অবতার-ই বলা হয় । যখন শঙ্করজীর নিকট সংবাদ পৌছায় যে ভগবান্‌ মোহিনী অবতারের দ্বারা অসুরদের মোহিত করেছেন আর দেবতাদেরকে অমৃত পান করিয়েছেন, তখন শঙ্কর জী বৃষ-বাহনে চড়ে ভগবান্‌ বিষ্ণুর দর্শন করতে আসলেন । ভগবানও তাঁকে বেশ স্বাগত-সৎকার করলেন । 

শঙ্কর জী প্রার্থনা করলেন, প্রভু ! যে মোহিনী অবতারের দ্বারা আপনি অসুরদের মোহিত করেছেন আর দেবতাদেরকে অমৃত পান করিয়েছেন, সেই রুপ আমি দর্শন করতে চাই ।

 

শিব জী কেন বিষ্ণুর মোহিনীরূপ দর্শন করতে চাইলেন তার একটি গূঢ় কারণ আছে ৷ ব্যাপারটি হচ্ছে, দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে বিষ্ণুর সহায়তাই দেবতারা বিজয় প্রাপ্ত হয়েছে, অসুররা অমৃতের ভাগ হতে বঞ্চিত হয়েছে ৷ এমতাবস্থায়, দেবতারা যেমন বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়ে জয় লাভ করেছে, তদ্রুপ অসুররা যদি শিবের শরণাপন্ন হন? শিব ভক্তবৎসল, তিনি শরণাগতকে বিমুখ করেন না ৷ তাই যদি অসুররা শিবের শরণাপন্ন হয়, তখন ত শঙ্করকে বিষ্ণুর বিপক্ষে দণ্ডায়মান হতে হবে ৷ বিষ্ণু শিবের আত্মা, আবার শিব বিষ্ণুর আত্মা, উভয়ের মধ্যে যাতে নিজ ভক্তদের সমর্থন হেতু সংঘর্ষ না বাঁধে তার উপায় কি? তাই অসুরা শিবের শরণ নেওয়ার পূর্বেই শিব জী বিষ্ণুর নিকট পৌছে গেলেন, এবং তাঁর মোহনীরূপ দেখতে চাইলেন ৷ উদ্দেশ্য এই যে, মোহনীরূপ দেখে স্বয়ং শিবও মোহিত হয়ে যাবেন, যাতে অসুররা মনে করে, যখন শিবও বিষ্ণুর মোহিনীরূপে মোহিত হয়ে গেল, তখন শিবের শরণাপন্ন হয়ে লাভ কি? তো, শিবের প্রার্থনায় বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করলেন, আর শিব তাতে মোহিত হয়ে গেল ৷ হস্তী যেমন হস্তিনীর পশ্চাতে ধাবিত হয়, তেমনি শিবও মোহিনীরূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর প্রতি ধাবিত হলেন ৷ শিব কামের বশীভূত হয়ে গেলেন, তাঁর রেত পতিত হলো ৷ শিবের রেত অমোঘ, সুতরাং তা নিষ্ফল হতে পারে না, যে যে স্থানে শিবের রেত পতিত হলো সে স্থান যেন সোনা-রূপার খনিতে পরিণত হলো অর্থাৎ সে সকল স্থান বিশেষ ঐশ্বর্যসম্পন্ন হয়ে গেল ৷ 
 
মূর্খ দয়ানন্দীরা সোনা-রুপার খনিকে আক্ষরিক অর্থে বিচার করে, তাই বলে যে, শিবের বীর্য (রেত) থেকে কি করে সোনা-রূপার খনি হতে পারে? “পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি” এই বাক্যে ঐ মূর্খ দয়ানন্দী অগ্নিবিড়ীখোর পোলাপাইনগুলা চাঁদকে সত্য সত্যিই রুটি মনে করে খেতে উদ্যত হতে পারে! আসুরিক বুদ্ধি হলে যা হয় আর কি!! 
 দেখ, ভাগবতের মূল শ্লোকে ‘রেতঃ’ শব্দ আছে, রেত শব্দের অর্থ কেবল বীর্যই নয়, নিঘণ্টু অনুসারে রেত অর্থ জল, বৃষ্টি ইত্যাদিও হয় ৷ সুতরাং মোহিনী রূপের পিছে ধাবিত হওয়ার সময় শিবের কৃপাবৃষ্টি বর্ষিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান ঐশ্বর্যসম্পন্ন হয়-- এই অর্থ ৷ 
নিঘণ্টু ১.১২

 
বেদেও রেত কামনা করা হয়েছে, রেতোধা রেতো দধাতু” (যজুঃ ২৩/২০) 
এর অর্থ: রেতোধা= হে রেতধারণকারী, রেতো= রেত, দধাতু= আমাকে প্রদান করুন ৷
 
 দয়ানন্দীদের বাপ পুরাণবিদ্বেষী কালপ্রিট দয়ানন্দ এই মন্ত্রের ভাষ্যে লিখেছে--
যজুঃ ২৩/২০, দয়ানন্দ ভাষ্য


(রেতোধাঃ) যো রেতঃ শ্লেষমালিঙ্গনং দধাতি সঃ (রেতঃ) বীর্য পরাক্রম্ (দধাতু) ৷ দয়ানন্দ সংস্কৃতে যা লিখেছে তার অর্থ--আলিঙ্গন প্রদানকারী বীর্য পরাক্রম দান করুক ৷ 😃 কিন্তু দয়ানন্দের ভাষ্যের হিন্দী অনুবাদে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে টুইষ্ট করে ভিন্ন অর্থ লেখা হয়েছে! যাহোক, বেদ বা দয়ানন্দের ভাষ্যে রেত-বীর্য থাকলে দয়ানন্দীরা তা স্বাদু স্বাদু বলে গিলে ফেলে, কিন্তু পুরাণের বেলায় তাদের গলায় বাঁধে কেন???
 

শনিবার, ৮ মে, ২০২১

বেদ ও উপনিষদ হতে রাহুল ব্রাদার প্রদর্শিত গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণের প্রমাণ খণ্ডন : পর্ব ১

 

মহেন্দ্র পাল আর্যের সাথে এক অনলাইন আলোচনাতে ব্রাদার রাহুল নামে পরিচিত এক মুসলিম বক্তা কিছু ভ্রান্ত অনুবাদ দর্শিয়ে হিন্দুধর্মে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণের অনুমতি আছে বলে প্রমাণের চেষ্টা করে । আমরা রাহুল ব্রাদার প্রদর্শিত প্রমাণগুলোর সঠিক অনুবাদ দেখাচ্ছি -

ঋগ্বেদ ১০।৮৬।১৩-১৪ 

রাহুল ব্রাদার প্রদর্শিত অনুবাদ :

১৩) হে বৃষাকপিবনিতে! তুমি ধনশালিনী ও উৎকৃষ্ট পুত্রযুক্তা এবং আমার সুন্দরী পুত্রবধূ। তোমার বৃষদিগকে ইন্দ্র ভক্ষণ করুন, তোমার অতি চমৎকার, অতি সুখকর হোমদ্রব্য তিনি ভক্ষণ করুন। ইন্দ্র সকলের শ্রেষ্ঠ।

১৪) আমার জন্য পঞ্চদশ এমন কি বিংশ বৃষ পাক করিয়া দেয়, আমি খাইয়া শরীরের স্থূলতা সম্পাদন করি, আমার উদরের দুই পার্শ্ব পূর্ণ হয়। ইন্দ্র সকলের শ্রেষ্ঠ।

অপরপক্ষে শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ :

১৩) হে বৃষাকপায়ি ! (বৃষাকপির মাতা বা পত্নী) আপনি ধনবতী, শ্রেষ্ঠ পুত্রবতী আর সুন্দর পুত্রবধূ যুক্ত । আপনার উক্ষাগণকে ইন্দ্রদেব শীঘ্র সেবন করক । আপনার প্রিয় এবং সুখপ্রদ হবিষান্ন তিনি সেবন করুক । ইন্দ্রদেবই বাস্তবে সর্বোত্তম ।

[উক্ষা অর্থ বৃষও হয়, কিন্তু এখানে তা যুক্তিসংগত নয় ৷ পুষ্টিদায়ক ওষধি তথা সেচন সামর্থ্য এখানে সমীচীন হয়]

১৪) (ইন্দ্রের কথন) আমার জন্য শচী দ্বারা প্রেরিত পনের-বিশ উক্ষা (সেচন সামর্থ্য, ইন্দ্রিয় ও প্রাণ-উপপ্রাণ আদি) একসাথে পরিপক্ব হয়, তা সেবন করে আমি পুষ্ট হই । আমার দুই পার্শ্ব উহার দ্বারা ভরে যায়, বিশ্বে ইন্দ্রদেবই সর্বোপরি আছেন ।

(ঋগ্বেদ ১০।৮৬।১৩-১৪, শ্রী রাম শর্মা)
অর্থাৎ শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ অনুযায়ী এখানে গোহত্যা অনুমদিত নয় ।



ঋগ্বেদ ১০।২৭।২

রাহুল ব্রাদার প্রদর্শিত অনুবাদ : 
(ঋষি কহিতেছেন)-যে সকল ব্যক্তি দৈবকর্মের অনুষ্ঠান না করে এবং কেবল তাহাদিগের নিজের উদর পূরণ করিয়া স্মৃতি হইয়া উঠে, আমি যখন তাহাদিগের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে যাই, তখন, হে ইন্দ্ৰ! তোমার নিমিত্ত পুরোহিতদিগের সহিত একত্র স্থূলকায় বৃষকে পাক করি এবং পঞ্চদশ তিথির প্রত্যেক তিথিতে সোমরস প্রস্তুত করিয়া থাকি ।

অপরপক্ষে শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ :

(ঋষি বসুক্র বলছেন) হে ইন্দ্র, যখন আমি দেবোপসনা রহিত ও শারিরীক সামর্থ্য দ্বারা অভিমানী (দাম্ভিক) মানুষের সাথে সংঘর্ষ করতে যাই, তখন আমি আপনাকে হব্য দ্বারা সন্তুষ্ট করি । আমি পঞ্চদশ তিথিতে আপনাকে সোম সমর্পিত করি ।

(ঋগ্বেদ ১০।২৭।২, শ্রী রাম শর্মা)



ঋগ্বেদ ১০।২৮।৩।

রাহুল ব্রাদার প্রদর্শিত অনুবাদ :

হে ইন্দ্র! যখন অন্ন কামনাতে তোমার উদ্দেশে হোম করা হয়, তখন তারা শীঘ্র শীঘ্র প্রস্তরফলক সহযোগ মাদকতাশক্তিযুক্ত সোমরস প্রস্তুত করে, তুমি তাহা পান কর। তাহারা বৃষভসমূহ পাক করে, তুমি তাহা ভোজন কর।
অপরপক্ষে শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ :  

(ঋষির কথন) হে ইন্দ্রদেব ! আপনার জন্য পাষাণ খণ্ডের ওপর শীঘ্রতাপূর্বক অভিষুত আনন্দপ্রদ সোমরসকে যখন যজমান ব্যক্তি প্রস্তুত করে, তখন আপনি তার দ্বারা প্রদত্ত সোমরস পান করে থাকেন । হে ঐশ্বর্য-সম্পন্ন ইন্দ্রদেব ! যে সময় সৎকার-পূর্বক হবিষ্যান্ন দ্বারা যজ্ঞ করা হয়, সে সময় সাধকগণ বৃষভ (শক্তিসপম্পন্ন হব্য)-কে পাক (পরিপক্ক) করেন, আর আপনি তা সেবন করে থাকেন । 

শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ অনুসারে  এখানে বৃষভ অর্থ শক্তিসপম্পন্ন হব্য, ষাড় নয় । সুতরাং এখানেও গোহত্যা অনুমদিত নয় ।

বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৬/৪/১৮

রাহুল ব্রাদার বৃহদারণ্যক উপনিষদ হতে গোমাংস ভক্ষণের প্রমাণ দেখিয়েছে, কিন্তু সেই মন্ত্রের শ্রী রাম শর্মা কৃত অনুবাদ দেখুন-

যার এই ইচ্ছা যে, আমার পুত্র প্রখ্যাত বিদ্বান, বিদ্বানগণের সভাতে সম্মান প্রাপ্ত কুশল বক্তা, প্রিয়ভাষী ও সব বেদের জ্ঞাতা আর শতায়ু হোক, সেই দম্পত্তী উক্ষা বা ঋষভ নামক ওষধীর মাংসল অংশ আর চালের ভাত (খিচড়ী) পাক করে, তাতে ঘৃত মিশিয়ে সেবন করবে । এই ক্রিয়া দ্বারা তারা উপর্যুক্ত গুণ সম্পন্ন পুত্র প্রাপ্তিতে সক্ষম হবে । 
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৬/৪/১৮, শ্রী রাম শর্মা)

সুতরাং এখানে উক্ষা বা ঋষভ নামক ওষধীর কথা বলা হয়েছে, বৃষ বা ষাড়ের মাংস নয় । ভ্রমপূর্ণ অনুবাদের দ্বারা অনেকেই ভুল বুঝে থাকেন ।






শনিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২১

বিস্ময়কর ব্যাখ্যা : ন তস্য প্রতিমা অস্তি






শুক্লযজুর্বেদের “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” এই শ্রুতি বাক্যটুকু সকলের পরিচিত ৷ এই শ্রুতি বাক্যটুকু দিয়েই দয়ানন্দ সরস্বতী, রাজা রামমোহন রায় প্রভৃতি মূর্তিপূজা বিরোধীরা মূর্তিপূজার বিরোধীতা করেছিলেন ৷ অপরপক্ষে সনাতনধর্মাবলম্বী পণ্ডিতগণ এই শ্রুতি বাক্যকে মূর্তিপূজার বিরোধী মনে করেন না ৷ কারণ প্রতিমা শব্দের অর্থ কেবল মূর্তি বা প্রতিকৃতিই নয়, প্রতিমা অর্থ তুলনা, সাদৃশ্য ইত্যাদি অর্থও রয়েছে ৷ সুতরাং “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” অর্থ তাঁর তুলনার পাত্র বা সাদৃশ্যমান কেউ নাই ৷ 

যাহোক না কেন, বস্তুত দয়ানন্দ সরস্বতী, রাজা রামমোহন রায়, হযরত মুহাম্মদ প্রভৃতি যত ছিরুই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করুক না কেন, সনাতনধর্ম থেকে প্রতিমা পূজার উচ্ছেদ কেউ কোনদিন করতে পারবে না ৷ 

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে ৷ উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা ছাড়াও ঐ শ্রুতিবাক্যের একটি বিস্ময়কর ব্যাখ্যা পেয়েছি, সেটিই বলব ৷ সাধারণ প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোতে “ন” আর “তস্য” শব্দ দুটিকে দুটি ভিন্ন পদ মানা হয় ৷ কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাখ্যাটি যিনি দিয়েছেন, তাঁর নাম বলতে আমি অনিচ্ছুক, তিনি মনে করেন “ন” আর “তস্য” দুটি ভিন্ন পদ নয়; মূলত এখানে একটি পদ, অর্থাৎ এরূপ “নতস্য” ৷ এখানে ‘নত’ শব্দের সাথে ষষ্ঠী বিভক্তি প্রয়োগে ‘নতস্য’ হয়েছে ৷ 

তাহলে “নতস্য প্রতিমা অস্তি” এর অর্থ হচ্ছে--

 নতস্য= ‘নত’ এর অর্থাৎ নতজানু ; প্রতিমা= মূর্তি ; অস্তি= আছে ৷ পরমেশ্বর রাম-কৃষ্ণ প্রভৃতি রূপে শিশুকালে নতজানু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে লীলা করেছেন, সেই নতজানু হামাগুড়িরূপে পরমেশ্বরের প্রতিমা জগতে বিদ্যমান রয়েছে --এই অর্থ ৷ 



 

ব্যাখ্যাটি আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে, তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম ৷ আপনাদের কেমন লাগল, মতামত জানান ৷ ধন্যবাদ ৷ 

//ওঁ শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু //

বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী কৃত মনগড়া ভাষ্য খণ্ডন Counter Reply সহ

 


আয়ং গৌঃ পৃশ্নিরক্রমীদসন্ মাতরং পুরঃ।
পিতরং চ প্রযন্তস্বঃ ।। (শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬)
ঋষ্যাদি— ওঁআয়ংগৌরিতি সর্পরাজ্ঞীকদ্রূর্ঋষিঃ ৷ গায়ত্রী ছন্দঃ ৷ অগ্নিদেবতা ৷ গার্হপত্যাহবনীয়দক্ষিণাগ্নিস্থাপনে বিনিয়োগ ৷
(এই মন্ত্রের ঋষি- সর্পরাজ্ঞী ৷ ছন্দ- গায়ত্রী ৷ দেবতা- অগ্নি ৷ গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণাগ্নি স্থাপনে এই মন্ত্রের বিনিয়োগ)
.
মন্ত্রার্থ— (অয়ম্) এই দৃশ্যমান অগ্নি (গৌঃ) যজ্ঞনিষ্পত্তির নিমিত্ত যজমানের গৃহে গমনশীল, (পৃশ্নিঃ) লোহিত, শ্বেত, পীত প্রভৃতি বর্ণের শিখাযুক্ত হয়ে () সর্ব প্রকারে অর্থাৎ আহবনীয়, গার্হপত্য ও দক্ষিণাগ্নি স্থানে (অক্রমীৎ) পাদবিক্ষেপ করে ; (পুরঃ) পূর্ব দিকে (মাতরম্) মাতৃরূপা পৃথিবীকে (অসদৎ) প্রাপ্ত করে, (স্বঃ) সূর্যরূপে (প্রয়ন্) সঞ্চরণ করে (পিতরঞ্চ) পিতারূপ দ্যুলোককে (অসদৎ) প্রাপ্ত করে ৷
.
প্রমাণ— ‘স্বঃ আদিত্যো ভবতি’ (নিরুঃ ২৷১৪)
‘দ্যৌর্নঃ পিতা ... মাতা পৃথিবী’ (অথর্ববেদ ৯৷১০৷১২)
.
দয়ানন্দ কৃত মনগড়া ব্যাখ্যা— (অয়ম্) এই প্রত্যক্ষ (গৌঃ) গোলরূপী পৃথিবী (পিতরম্) পালনকারী (স্বঃ) সূর্যলোককে (পুরঃ) আগে আগে (মাতরম্) নিজের যোনিরূপ জলের সাথে বর্তমান হয়ে (প্রয়ন্) প্রকৃষ্টভাবে চলতে থেকে (পৃশ্নিঃ) অন্তরিক্ষে (অক্রমীৎ) চারিদিকে ঘুরতে থাকে ৷
.
দয়ানন্দের ব্যাখার সমালোচনা—
i) মন্ত্রটির দেবতা অগ্নি, তাই মন্ত্রের ‘অয়ম্’ পদে অগ্নিই নির্দেশিত হওয়া উচিত ৷ কিন্তু দয়ানন্দ ‘অয়ম্’ পদটি পৃথিবী নির্দেশার্থ ব্যবহার করেছে, আর মন্ত্রটির দেবতা অগ্নি হওয়া সত্ত্বেও দয়ানন্দের কৃত মূল ব্যাখ্যাতে অগ্নির কোন প্রসঙ্গই নাই ৷
ii) এই মন্ত্রের বিনিয়োগ গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণাগ্নি স্থাপনে, অথচ দয়ানন্দের ব্যাখ্যাতে বিনিয়োগাদির বিন্দুমাত্র উল্লেখ নাই ৷ যজুর্বেদ যজ্ঞ সম্পাদনের নিমিত্ত, তাই দয়ানন্দের ভাষ্যে যজ্ঞের কোন বিধি-বিধান ও বিনিয়োগের উল্লেখ না থাকায়, উহা ভাষ্যের নামে কেবল ফাঁজলামি মাত্র ৷ সুতরাং উহা তা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাজ্য ৷
iii) দয়ানন্দ ‘গৌঃ’ অর্থ গোলরূপী পৃথিবী লিখে, পৃথিবীকে গতিশীল সিদ্ধ করেছে ৷ কিন্তু নিঘুণ্টে গৌঃ শব্দ পৃথিবীর নাম হিসেবে পঠিত হলেও নিরুক্তকার যাস্ক অন্তরিক্ষে গতিশীল বোঝাতে গৌঃ শব্দটি পৃথিবী অর্থে ব্যবহার না করে বরং সূর্য অর্থেই ব্যবহার করেছেন ৷ প্রমাণ - “গৌঃ আদিত্যো ভবতি ৷ গময়তি রসান্, গচ্ছতি অন্তরিক্ষে” (নিরুক্ত ২.১৪) ৷ আবার মন্ত্রে যে ‘পৃশ্নিঃ’ শব্দটি আছে তাও সূর্যেরই বোধক ৷ প্রমাণ- “পৃশ্নিঃ আদিত্যো ভবতি ৷ প্রাশ্নুতে এনং বর্ণঃ ইতি নৈরুক্তা” (নিরুক্ত ২.১৪)৷ বিচিত্র বর্ণ অগ্নিই সূর্যরূপে অন্তরীক্ষে গমন করে ৷ সুতরাং দয়ানন্দ যে পৃথিবীর গতিশীলপক্ষে মন্ত্রের ভাষ্য তা সম্পূর্ণ তার মনগড়া, পাশ্চাত্য দেশের বিজ্ঞানের তথ্য সে বেদমধ্যে ঢুকিয়েছে মাত্র, এরকম সে ঋগ্বেদে (১৷১১৯৷১০) টেলিগ্রাফের কথা ঢুকিয়েছে 🐸 ৷ আবার সে বলে যে, সূর্যে নাকি মানুষ বাস করে 🐸


 বেদের যা মূল অর্থ তা-ই বলা উচিত, নাকি নিজের ইচ্ছামতো যেটা ইচ্ছা সেটা বেদের নাম দিয়ে বেদের মুখ দিয়ে বলানো উচিত? স্বয়ং বিচার করুন ৷
[দয়ানন্দ এরূপ বেদের মনগড়া ব্যাখ্যা করে বেদের মর্যাদা হানি করেছে, তাই দয়ানন্দের অপব্যাখ্যার খণ্ডন জরুরী, এজন্যই বাংলাতে খুব শীঘ্র করপাত্রী মহারাজ কৃত দয়ানন্দের ভাষ্য খণ্ডনসহ যজুর্বেদ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে]
 
......................................................................................................................................
 আমার এই পোস্টের বিরুদ্ধে দয়ানন্দীরা যে পোস্ট লিখেছে তা খণ্ডনসহ দেওয়া হলো-

 
যজুর্বেদ ৩/৬ এর সংস্কৃত ভাষ্যে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী সমস্তকিছুর Reference দিয়েছেন কোন শব্দের অর্থ কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু করপাত্রীর মত ভন্ডদের সেগুলো সমস্তকিছু যথাযথভাবে তুলে ধরে তথাকথিত মহাখন্ডনের সৎসাহসটুকুই নেই। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী যজুর্বেদ৩/৬ এর বৈদিক সংস্কৃত থেকে লৌকিক সংস্কৃততে যেই ভাষ্য করেছেন তার বঙ্গানুবাদ করলে হয়, 
★आयं गौः पृश्नि॑रक्रमी॒दस॑दन् मा॒तरं॑ पु॒रः। पि॒तरं॑ च प्र॒यन्त्स्वः॑॥ 
আয়ং গৌঃ পৃশ্নিরক্রমীদসদন মাতরং পুরঃ। পিতরং চ প্রয়তস্বঃ।। -[যজুর্বেদ ৩।৬] 
পদার্থ- (অয়ং) এই প্রত্যক্ষ (গৌ) পৃথিবী [নির্ঘণ্ট১.১,নিরুক্ত২.৫] (মাতরং) নিজ মাতৃরূপ জল সহিত বর্তমান হয়ে (পৃশ্মি) অন্তরীক্ষে [অষ্টাধ্যায়ী ৭.১.৩৯,নির্ঘণ্ট ১.৪] (অসদত) স্বকক্ষে (প্রয়ন) উত্তম প্রকারে চলছে এবং (পিতরং) পালনকারী (স্বঃ) সূর্যলোকের [নিরুক্ত ২/১৪] (পুরঃ) আগে (আক্রমীত) চারপাশে ঘুরছে। 
এখন আপনারা সকলেই জানেন ভাগবতপুরাণ স্পষ্টতই সূর্যের পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এখন কিছু মানসিক বিকৃতিগ্রস্ত কুলাঙ্গার পুরাণের এই কুসংস্কারের সাথে বেদকে মেলানোর হাস্যকর প্রচেষ্টা করছে। এইসব জোকারগুলো হচ্ছে করপাত্রী নামে এক ভন্ড ও তার অনুসারীগণ। এখন দেখি এই জোকারগুলো বেদকে ভাগবতপুরাণের সাথে মেলানোর কি কি অপচেষ্টা করেছে। 
১) প্রথমে "গৌ" শব্দ নিয়ে এই ব্যাক্তি কি বলল নীজেও বুঝেছে কিনা আমার সন্দেহ রয়েছে। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী "গৌ" শব্দের অর্থ পৃথিবী নিয়েছেন। এখন গৌ অর্থ যে পৃথিবী সেই বিষয়ে তিনি নিরুক্ত ও নির্ঘণ্ট উভয় থেকেই তার সংস্কৃত ভাষ্যে প্রমাণ দিয়েছেন। যেমন, ★ गौरिति पृथिव्या नामधेयम्। यद् दूरं गता भवति। यच्चास्यां भूतानि गच्छन्ति -[निरु॰२.५] অর্থ - পৃথিবীর নাম গৌ। কেননা, এটি দূর - দূর পর্যন্ত গমন করে। অথছ, করপাত্রী লিখল নিরুক্তে নাকি গৌ অর্থ পৃথিবী বলাই হয়নি। কতটা শিশুসুলভ মানসিকতার অধিকারী হলে এভাবে নীজেকে হাসির পাত্র বানাতে পারে কেউ! এখন করপাত্রী "গৌ" শব্দের অর্থ বের করল, " যজ্ঞনিষ্পত্তির নিমিত্ত যজমানের গৃহে গমনশীল " গৌ শব্দের বেদাঙ্গসিদ্ধ পৃথিবী অর্থকে খুবই দুর্বল মিথ্যাচারের মাধ্যমে অস্বীকার করে তিনি এর এতবড় মনগড়া অর্থ আবিষ্কার করল ভালো কথা। ত এই অর্থইবা নিরুক্তে কোথায় আছে একটু দেখান? না, এইবিষয়ে করপাত্রীজি সম্পূর্ণ চুপ। সে যাই হোক, গৌ শব্দের আরো বিভিন্ন অর্থ হয় এটা সঠিক। এখন মহর্ষি তার মধ্যে পৃথিবী অর্থটি নিলেন। তাতে ভুলটা কি হল? 
 
 Counter Reply: গাঁজাখোর, রমাবাঈের প্রেমিক পুরুষ ও সেক্সটনিকধারী দয়ানন্দের শিষ্য লিখেছে যে, “অথছ, করপাত্রী লিখল নিরুক্তে নাকি গৌ অর্থ পৃথিবী বলাই হয়নি।” এটি ডাহা মিথ্যা কথা, জন্মগত মিথ্যাবাদীদের কাছ থেকে মিথ্যাই আশা করা যায়, সত্য নয় ৷ আমার পোস্টে স্পষ্টই লেখা ছিল যে, "কিন্তু নিঘুণ্টে গৌঃ শব্দ পৃথিবীর নাম হিসেবে পঠিত হলেও নিরুক্তকার যাস্ক অন্তরীক্ষে গতিশীল বোঝাতে গৌঃ শব্দটি পৃথিবী অর্থে ব্যবহার না করে বরং সূর্য অর্থেই ব্যবহার করেছেন ৷ প্রমাণ - “গৌঃ আদিত্যো ভবতি ৷ গময়তি রসান্, গচ্ছতি অন্তরিক্ষে” (নিরুক্ত ২.১৪) ৷” সূর্যের নামও গৌঃ, আবার পৃথিবীর নামও গৌঃ ৷ কিন্তু মহর্ষি যাস্ক সূর্যেকেই অন্তরীক্ষে গমনশীল বলেছেন, পৃথিবীকে নয় ৷ পৃথিবীর নাম গৌঃ কেন, সে সম্বন্ধে বলেছেন- गौरिति पृथिव्या नामधेयम्। यद् दूरं गता भवति। यच्चास्यां भूतानि गच्छन्ति -[निरु॰२.५] অর্থঃ পৃথিবী দূর গতা বলে বা এর মধ্যে প্রাণীসমূহ গমন করে বলে, পৃথিবীর নাম গৌঃ ৷ পৃথিবীর দূর গতা অর্থ পৃথিবী দূর-দূরান্ত ব্যাপী ৷ পৃথিবীর মধ্যে প্রাণীসমূহ দূর থেকে সুদূরে গমানাগমন করে, তাই পৃথিবীর নাম গৌঃ ৷ মহর্ষি যাস্ক কিন্তু পৃথিবীকে অন্তরীক্ষে গমনকারী বলেন নাই, তাই দয়ানন্দ যে পৃথিবীকে অন্তরীক্ষে গমনশীল বলেছেন তা প্রামণহীন ৷ আর গৌঃ শব্দটি √গাম্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ গমন ৷ যেহেতু মন্ত্রটির দেবতা অগ্নি, তাই গৌঃ অর্থে যজ্ঞনিষ্পত্তির জন্য যজমানের গৃহে গমনশীল---এই অর্থই সমুচিত ৷ 
 
২) করপাত্রীজি বললেন, পৃশ্নি নাকি এখানে সূর্যসূচক। অথছ, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী পাণিনি অষ্টাধ্যায়ী ও নির্ঘণ্ট উভয় থেকেই তার ভাষ্যে প্রমাণ দেখিয়েছেন যে পৃশ্নি অর্থ " অন্তরিক্ষ " হয়। যেমন, ★अन्तरिक्षे। अत्र सुपां सुलुग्॰ [अष्टा॰७.१.३९] ★इति सप्तम्येकवचने प्रथमैकवचनम्। पृश्निरिति साधारणनामसु पठितम्। [निघं॰१.४] মহর্ষির দেওয়া এই স্পষ্টত বেদাঙ্গপ্রমাণগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরার মত সৎসাহসটুকুই এই শিশুর হলনা। 
 
Counter Reply: হাসাল মোর বালক! ওহে বালক, পৃশ্নিঃ অর্থ যখন অন্তরীক্ষ তখন, গৌঃ অর্থ সূর্য ধরলে না কেন? কারণ সূর্যই অন্তরীক্ষে গমন করে ৷ প্রমাণ - “গৌঃ আদিত্যো ভবতি ৷ গময়তি রসান্, গচ্ছতি অন্তরিক্ষে” (নিরুক্ত ২.১৪) ৷” আর নিঘুণ্টের শব্দগুলোরই ব্যাখ্যা রয়েছে নিরুক্তে ৷ তাই ওহে বালক, ব্যাখ্যাখানা একটু খুলে দেখ, গাঁজা খেয়ে দয়ানন্দের মতো মনগড়া ব্যাখ্যা করলে, গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়েই তো যাবে ☺৷ নিরুক্তে বলা হয়েছে- “পৃশ্নিঃ আদিত্যো ভবতি ৷ প্রাশ্নুতে এনং বর্ণঃ ইতি নৈরুক্তা” (নিরুক্ত ২.১৪)৷ এখানে স্পষ্টই আদিত্য অর্থাৎ সূর্যকেই পৃশ্নিঃ বলা হয়েছে, যেহেতু সূর্য সকল বর্ণ শোষণ করেন ৷ যেহেতু মন্ত্রটির দেবতা অগ্নি, তাই প্রাচীন ভাষ্যকারগণ পৃশ্নি অর্থ বিচিত্র বর্ণের শিখাযুক্ত অগ্নি করেছেন ৷ আবার অগ্নিই সূর্যরূপে অন্তরীক্ষে গমন করে ৷ সুতরাং প্রাচীন ভাষ্যকারগণ কৃত অর্থই সমীচিন, অর্বাচীন দয়ানন্দ কৃত অর্থ বানোয়াট ৷
 
 ৩) করপাত্রী আরেকটি দুর্বল মিথ্যাচার করল যে মন্ত্রের দেবতা অগ্নি। কিন্তু মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী নাকি অগ্নি নিয়ে তার ভাষ্যে কিছুই দেন নি। অথছ মহর্ষি তার ভাষ্যে ভাবানুবাদেই দিয়েছেন যে, " অগ্নি ও জলের নিমিত্ত হতে উৎপন্ন এই পৃথিবী " 
 
Counter Reply: এখানেও মিথ্যাবাদী দয়ানন্দের শিষ্যটি আমার পোস্টের তথ্য ভূলভাবে উপস্থাপন করেছে ৷ আমার পোস্টে বলা হয়েছিল যে, দয়ানন্দের কৃত “মন্ত্রের মূল ব্যাখ্যাতে” অগ্নির কোন প্রসঙ্গই নাই ৷ তা যখন মন্ত্রের মূল ব্যাখ্যাতেই অগ্নির কোন প্রসঙ্গ নাই, তখন দয়ানন্দ তার ভাবানুবাদে অগ্নির কথা ঢুকাল কি গাঁজা খেয়ে??? হয়ত বেচারা দয়ানন্দ ভয় পেয়েছিল, ভেবেছিল, মন্ত্রের দেবতা তো অগ্নি, কিন্তু আমি মন্ত্রটির যে ব্যাখ্যা বানালাম তাতে তো অগ্নির কোন স্থানই হলো না!! তাই চুপিসারে আমার নিজস্ব ভাবানুবাদে অগ্নির কথা ঢুকিয়ে দিই, নয়তো আমাকে লাথি-ঝাটা খেতে হতে পারে ৷ শুধু শুধু তো আর লোকজন আমার বক্তৃতাতে আমাকে জুতা-ইট-পাটকেল ছুড়ে মারে না! ! 
 
৪) করপাত্রী "গৌ" শব্দের বেদাঙ্গসিদ্ধ অর্থ "পৃথিবী" অস্বীকার করে "মাতরং" শব্দের অর্থ নিয়ে নিল " মাতৃরূপ পৃথিবী "। এখন তার এই অর্থ নেওয়ার পেছনে যুক্তি দেখাল যে অথর্ববেদের একটি মন্ত্রে বলা আছে, দ্যুলোক হল পিতা , পৃথিবী হল মাতা। এই ব্যাক্তির যুক্তিগুলো যে ছোট্টবাচ্চাদের মত তার প্রমাণ পূর্বেই অনেক পাওয়া গিয়েছে। এখন আরো বেশি পাওয়া গেল। এভাবে অন্য কোন মন্ত্রে কাকে পিতা ও মাতা বলা হয়েছে সে অনুসারে যজুর্বেদ৩/৬ এর ভাষ্য হবে! এরকম বহু মন্ত্রেই বহুজনকে পিতা ও মাতা বলা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রে ঈশ্বরকে পিতা ও প্রকৃতিকে মাতা বলা হচ্ছে। (অথর্ববেদ ৭/৬/১) তে প্রকৃতিকে মাতা ও পিতা বলে সম্মোধন করা হচ্ছে। (ঋগ্বেদ ৮/৯৮/১১) তে পরমাত্মার উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে যে, " আপনিই আমাদের পিতা, আপনি মাতা " এখন করপাত্রী (অথর্ববেদ৭/৬/১) (ঋগ্বেদ৮/৯৮/১১) কিংবা অন্যান্য মন্ত্রগুলো অনুসারে যজুর্বেদ ৩/৬ এ মাতা - পিতা বলতে " প্রকৃতি ", "পরমাত্মা " বা অন্যান্য ব্যবহৃত শব্দগুলো নিলনা কেন? এই করপাত্রী যে কতবড় মিথ্যাচারী তার পরিচয় এখান থেকেই পাওয়া যায়। 
 
 Counter Reply: বালার্যদের এই পয়েন্টটি সবচেয়ে বেশি শিশুসুলভ ও হাস্যকর ৷ কারণ তারা যে প্রশ্ন তুলেছে, সেই একই প্রশ্ন দয়ানন্দের ভাষ্যের প্রতি এবার আমি তুলব ৷ তারা বলেছে, অথর্ববেদের এই মন্ত্রে দ্যুলোককে পিতা, ও পৃথিবীকে মাতা বলা হলেও তা নাকি শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬ এর জন্য প্রযোজ্য নয় ৷ তাহলে, একইভাবে আমিও বলতে পারি যে, নিঘুণ্ট-নিরুক্তে গৌঃ অর্থ পৃথিবী হলেও তা শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬ এর জন্য প্রযোজ্য নয় ৷ তারা আরও বলেছে যে, অন্যান্য মন্ত্রে পরমাত্মাকেই পিতা-মাতা বলা হয়েছে, আবার কোথাও পরমাত্মাকে পিতা, আবার প্রকৃতিকে মাতা বলা হয়েছে---এসব অর্থ কেন করপাত্রীজী শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬ তে গ্রহণ করল না? একইভাবে, আমিও প্রশ্ন তুলতে পারি যে, নিরুক্তে তো সূর্যকেও গৌঃ বলা হয়েছে, আবার গৌঃ অর্থ গরুও হয়, তো এসব অর্থ কেন দয়ানন্দ শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬ তে গ্রহণ করল না? শোন রে মহামূর্খগণ! কোথায় কোন শব্দের কোন অর্থ গ্রহণ করতে হয়, তার জন্য প্রকরণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক, যা দয়ানন্দের কিঞ্চিৎ পরিমাণেও ছিল না ৷ যেমন- সৈন্ধবঃ নামে লবণ ও অশ্ব রয়েছে ৷ রান্নার সময়ে সৈন্ধব অর্থ লবণ, গমনের সময় অশ্ব বুঝতে হবে ৷ যদি কেউ রান্না প্রসঙ্গে সৈন্ধব অর্থ অশ্ব বোঝে, আর গমনের সময় লবণ বোঝে তবে সে মহামূর্থ ব্যতীত আর কি? দয়ানন্দ এইরূপ মহামূর্খ ছিল, তাই ছাগলটা প্রতিমা অর্থ তুলনা, সাদৃশ্য ইত্যাদি থাকতেও প্রকরণজ্ঞানহীনতার কারণে ‘ন তস্য প্রতিমা অস্তি’ মন্ত্রে প্রতিমা অর্থ মূর্তি ধরে প্রতিমাপূজার বিরোধীতা করেছিল ৷ এক অগ্নিই মাতৃরূপা পৃথিবীতে পার্থিব অগ্নিরূপে, অন্তরীক্ষে বিদ্যুতরূপে, পিতারূপী দ্যুলোকে সূর্যরূপে অবস্থান করে ৷ একারণে করপাত্রীজীর ভাষ্যই সঠিক, দয়ানন্দের ভাষ্য প্রকরণহীণ ভাবে প্রমাণাদির প্রয়োগ করায় তা ভ্রান্ত ৷ 
 
 ৪) এছাড়াও, এখানে দাবি করা হল যে মহর্ষি নাকি এভাবেই পাশ্চাত্য দেশের বিজ্ঞানের সাথে মেলাতে ঋগ্বেদ১/১১৯/১০ এ টেলিগ্রাফের কথা ঢুকিয়ে দিয়েছে। সত্য বিজ্ঞানের সাথে পাশ্চাত্য- দেশীয়র কি সম্পর্ক? তা উপলব্ধি করার মত সুস্থ মানসিকতস এদের নেই। তবুও এই গোয়ারদেরকে একটাই কথা বলব - টেলিগ্রাফির প্রযুক্তি পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা অাবিষ্কার করেছিল নাকি ভারতীয় বাঙালি হিন্দু বিজ্ঞানী ড. জগদীশ চন্দ্র বসু করেছিল তা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়ে পড়ে অাসুন। 
 
Counter Reply: দয়ানন্দ উল্লেখ করেছে তারওয়ালা টেলিগ্রাফের, আর জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছি তারবিহীন রেডিও বা ‘বেতার’ ৷ এ দুটোকে ঘুলিয়ে যে এক করে ফেলেছে, সেই মহামূর্খ নাদানটিরই কি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়া উচিত নয়?
 
৫)যজুর্বেদ ৩/৬ এ "গৌ" শব্দের বেদাঙ্গসিদ্ধ পৃথিবী অর্থ নিয়ে মিথ্যাচার করে সে নীজেকে যথেষ্ট হাসির পাত্র বানাল। কিন্তু বেদের অনেক মন্ত্রেই যে সরাসরি "পৃথিবী " শব্দ ব্যবহার করে পৃথিবীর গতিশীলতার বিষয়ে স্পষ্টত উল্লেখ অাছে। এই করপাত্রী সেগুলোরও সমীক্ষা করে নীজেকে আরেকটু হাসির পাত্র বানাল না কেন? 
★বীমে দ্যাবাপৃথিবী ইতো বি পন্থানো দিংশদিশম। -[অথর্ববেদ ৩।৩১।৪] 
অর্থ- (ইমে) এই (দ্যাবাপৃথিবী) সূর্য ও পৃথিবীলোক (বি ইত) বিশেষরূপে পৃথক পৃথক (পন্থান) মার্গে [আলাদা আলাদা কক্ষপথে] (দিংশ দিশম) ভিন্ন দুই দিশায় [ ভিন্ন গতিতে] ( বি=যন্তি) গতিশীল রয়েছে। 
 
 Counter Reply: যেমন দয়ানন্দের শুক্লযজুর্বেদ ৩/৬ মন্ত্রটির ব্যাখ্যা ভুল, তেমনি এই মন্ত্রটির প্রদত্ত অর্থও ভুল ৷ সম্পূর্ণ মন্ত্র ও সঠিক অর্থ - 
 
বীহ'মে দ্যাবাপৃথিবী ইতো বি পন্থনো দিশংদিশম্। 
ব্যহং সর্বেণ পাপ্মনা বি যক্ষ্মেণ সমায়ুষা ॥ [অথর্ববেদ ৩।৩১।৪]
যেমন (ইমে) এই (দ্যাবাপৃথিবী) আকাশ ও পৃথিবী (বি ইতঃ) স্বভাবতঃ পৃথক পৃথক হয়ে থাকে, আর (দিশংদিশম্) এক দি হতে অপর দিকে গমনের (পন্থানঃ) পথসমূহ  (বি) যেমন পৃথক-পৃথক হয়ে থাকে, তেমনই এই বালককেও (অহং) আমি (সর্বেণ পাপ্মনা বি) স্বভাবতঃ সকল পাপ হতে বিযুক্ত হয়ে অবস্থানশালী করে দিচ্ছি। (যক্ষ্মেণ বি) যক্ষ্মা রোগ হতে বিযুক্ত করে একে (আয়ুষা সম্‌) দীর্ঘ আয়ুষ্মত্তা প্রদান করছি।
 উল্লেখ্য যে, আর্যসমাজী হরিশরণ, তুলসীরাম শর্মার অনুবাদও একই প্রকার ।
পরিশেষে, এই করপাত্রী একজন অদ্বৈতবাদী - মায়াবাদী তথাকথিত ধর্মগুরু। অন্যদিকে তার শিশুসুলভ ভাষ্য থেকে কপি মেরে পোস্ট করেছে সে একজন খাঁটি বৈষ্ণব। কিন্তু বৈষ্ণবমত হল আর্যসমাজের মতই কঠোরভাবে অদ্বৈতবাদের বিরোধী। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু শাস্ত্রের অদ্বৈতবাদী-মায়াবাদী ভাষ্য পড়লে সর্বনাশ হয় বলেছেন(চৈ.চ, মধ্যলীলা ৬/১৬৯)
 
Counter Reply: যদিও আমি নিজেকে বৈষ্ণব বলে দাবি করি না, কারণ সে পর্যায়ে আমি এখনো উঠিনি, তবুও দয়ানন্দীটি আমাকে খাঁটি বৈষ্ণব বলায় বেশ প্রীত হলাম ৷ শোন রে দয়ানন্দী, বৈষ্ণবগণ ‘বাদ’কে অমান্য করতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তিটিকে তারা অশ্রদ্ধা করেনা ৷ গীতা-ভাগবতের টীকাকার শ্রীধর স্বামি ছিলেন অদ্বৈতবাদী, তিনি অদ্বৈবাদী হলেও ভক্তিবাদী ছিলেন এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে যার পর নাই মান্য করেন ৷ তেমনিই করপাত্রী মহারাজও একজন ভক্তিবাদী ভাগবত মহাপুরুষ ৷ ভাগবতের ওপর লেখা তাঁর গ্রন্থও রয়েছে, যথা- ভাগবত সুধা, ভ্রমর গীতা ইত্যাদি ৷ আর তিনি যজুর্বেদের যা মূল অর্থ তাই-ই ব্যক্ত করেছেন, তিনি তাঁর নিজ মত দয়ানন্দের মতো বেদের মধ্যে ঢুকাননি যে তা পড়লে সর্বনাশ হবে ৷ 
 
এইরূপে প্রতিপাদিত হলো যে, দয়ানন্দীরা দয়ানন্দের ভুল ব্যাখ্যাকে ঢাকতে যতই কুপ্রচেষ্টা, গুজামিল তথ্য দিক না কেন তা সকলই মিথ্যা ৷
 
।। ওঁ শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু ।।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

শুভ জন্মাষ্টমী : ভগবানের জন্ম কিভাবে সম্ভব?




♥ শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা ♥
আজ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি, এই দিনে জন্ম হয়েছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের, তাই একে জন্মাষ্টমী বলে ৷ জন্মাষ্টমী = জন্ম + অষ্ঠমী ৷ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি বিশ্বজগতের পিতা, তিনি কিনা বসুদেব ও দেবকীর পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করলেন? এ বড় অদ্ভূত সন্দেশ নয় কি? কি প্রয়োজন ছিল স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পৃথিবীতে জন্ম নেবার?

বাস্তবিকপক্ষে, ভগবানের নিজের তো কোন প্রয়োজন নাই পৃথিবীতে জন্ম নেবার, তবুও যে তিনি জন্ম নিলেন তা কেবল আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে, মানবজাতির হিতকল্যাণ করার জন্য ৷ আমরা অধম, ধর্ম-কর্ম জানিনা, কে শেখাবে আমাদের? যদি বলো যে, তিনি কোন প্রবর্তক মহাপুরুষ পাঠিয়ে দিতে পারতেন, আমাদের শেখাবার জন্য ৷ কিন্তু বলো দেখি সেই প্রবর্তক মহাপুরুষ কার কাছ থেকে শিখে আমাদের শেখাবেন? তাই ভগবান হচ্ছেন আদিগুরু, তাই তিনি স্বয়ং মানুষরূপে অভিনয় করে মানুষকে শেখান ৷ “আপনি আচারিয়া ধর্ম লোকেরে শেখায়” ৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন একথা -

“শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যাহা যাহা আচরণ করেন, অপর সাধারণেও তাহাই করে । তিনি যাহা প্রামাণ্য বলিয়া বা কর্তব্য বলিয়া গ্রহণ করেন, সাধারণ লোকে তাহারই অনুবর্তন করে । হে পার্থ, ত্রিলোক মধ্যে আমার করণীয় কিছু নাই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছু নাই, তথাপি আমি কর্মানুষ্ঠানেই ব্যাপৃত আছি । হে পার্থ, যদি অনলস হইয়া কর্মানুষ্ঠান না করি, তবে মানবগণ সর্বপ্রকারে আমারই পথের অনুবর্তী হইবে । (কেহই কর্ম করিবে না) ।” (পবিত্র গীতা ৩/২১—২৩)

তিনি নিজের আবির্ভাব সম্পর্কে আরো বলেছেন -

অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্যামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ।।
— “আমি জন্মরহিত, অবিনশ্বর এবং সর্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও স্বীয় প্রকৃতিতে অনুষ্ঠান করিয়া আত্মমায়ায় আবির্ভূত হই ।” (ঐ, ৪/৬)

ভগবান জন্মরহিত, অর্থাৎ তার জন্মের বাধ্যবাধকতা নাই, সাধারণ জীব পূর্বজন্মের সঞ্চিত কর্মফল ভোগের জন্য জন্ম নিতে বাধ্য, কিন্তু ভগবান জন্ম নেন ‘আত্মমায়ায়’ অর্থাৎ নিজ ইচ্ছায় ৷ কেন? উত্তর—

যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।।
— “হে ভারত ! যখনই যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, আমি সেই সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই) ।” (ঐ, ৪/৭)

পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।
— “সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই ।” (ঐ, ৪/৮)

সাধারণ লোকেরা জন্ম নিজ ইচ্ছা অনুসারে হয়না, হয় কর্মানুসারে, কারণ তারা কর্ম করে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয় ৷ কিন্তু ভগবান জন্ম-কর্ম কেবল লোকশিক্ষার্থ, তিনি জন্ম-কর্ম করেও তাতে আবদ্ধ হননা ৷ তাই ভগবানের জন্ম কর্ম দিব্য অর্থাৎ অলৌকিক ৷

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ।।
—“হে অর্জুন, আমার এই দিব্য জন্ম ও কর্ম যিনি তত্ত্বতঃ জানেন, তিনি দেহত্যাগ করিয়া পুনর্বার আর জন্মপ্রাপ্ত হন না - তিনি আমাকেই প্রাপ্ত হন ।” (ঐ, ৪/৯)

ভগবানের পক্ষে এই জগৎ এক রঙ্গমঞ্চ ৷ অভিনেতা যেমন নাট্যমঞ্চে বিভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছেদ ধারণ করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে, ভগবানও তদ্রুপ বিভিন্ন নাম-রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হয়ে অভিনয় (লীলা) করেন ৷ তার জন্ম-কর্ম লোকশিক্ষার্থ ও স্বীয় ভক্তজনকে আনন্দ প্রদানার্থ অভিনয় মাত্র ৷

শ্রীশুকদেব গোস্বামী তাই বলেছেন-
“হে রাজন্! অভিনেতা যেরুপ স্বরুপতঃ অবিকৃত থাকিয়াই রঙ্গমঞ্চে দর্শকগণের সমক্ষে বিবিধ জন্মমরণাদি লীলা অভিনয় করে, পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের যাদবাদিকুলে আবির্ভাবতিরোভাবচেষ্টাও সেরুপ মায়াভিনয়মাত্র জানিবে ৷ বস্তুতঃ সেই পরমপুরুষ স্বয়ংই এই জগৎ সৃষ্টি করেন, এতে অবতরণ করেন ও বিহার করেন এবং লীলা শেষে নিজ স্বরুপে স্থিত হন ৷”
[ #শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ ১১৷৩১৷১১]

প্রপঞ্চং নিষ্প্রপঞ্চোহ’পি বিড়ম্বয়সি ভূতলে ৷
প্রপন্নজনতানন্দসন্দোহং প্রথিতং বিভো ৷৷
“হে বিভো শ্রীকৃষ্ণ, তুমি প্রপঞ্চাতীত হয়েও ভক্তজনগণের আনন্দসমূহ বিস্তার করার জন্য ভূতলে প্রপঞ্চস্থ পুত্রাদিভাবের অনুকরণ করছো ৷” [#শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ ১০৷১৪৷৩৭]

মমস্তস্মৈ ভগবতে কৃষ্ণায়ামলকীর্ত্তয়ে ৷
যো ধত্তে সর্ব্বভূতানামভবায়োশতীঃ কলাঃ ৷৷
“যে সর্ব্বেশ্বর ভগবান্ নিখিল জীবগণের সংসার-দুঃখের নিবারণার্থ কমনীয় বিগ্রহ-সমূহ ধারণে আবির্ভূত হন, সেই পবিত্রকীর্ত্তি ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণকে আমি প্রণাম করি ৷” [শ্রীমদ্ভাগবত ১০৷৮৭৷৪০]


//ওঁ শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু //

শনিবার, ৯ মে, ২০২০

Counter Post: নেম ও ইন্দ্র – প্রকৃত রহস্য উন্মোচন সমীক্ষা





জানতে পারলাম যে দয়ানন্দীরা নাকি আমার ব্লগের বৈদিক ঋষির সাকার ঈশ্বর দর্শন —এই পোস্টের এক অংশের বিরুদ্ধে পোস্ট লিখছে ৷ সেই পোস্টি সমীক্ষাসহ নিচে দেওয়া হলো-
"নেম ও ইন্দ্র– প্রকৃত রহস্য উন্মোচন"
ঋগ্বেদের ৮ম মণ্ডলের ১০০তম সূক্তের ঋষি হচ্ছেন ভার্গব নেম। এই সূক্তের ৩য় ও ৪র্থ মন্ত্রকে মাঝ থেকে তুলে দিয়ে অনেকে অপপ্রচার চালায় যে, নেম ঋষি নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের উপর প্রশ্ন তোলায় ইন্দ্র অর্থাৎ পরমেশ্বর সাকার রূপ ধরে ঋষির সামনে এসে হাজির হয়ে নিজের অস্তিত্বের  প্রমাণ দিয়েছেন।
এই বিষয়ে অপপ্রচারকারীদের প্রদত্ত মন্ত্রের উদ্ধৃতি দেখে নেওয়া যাক–
"নেম ঋষি বলেন, ইন্দ্র নামে কেউ নেই। কে তাঁকে দেখেছে? আমরা কাকে স্তুতি করব?
(ঋগ্বেদ ৮/১০০/৩)
পরম ঐশ্বর্যবান ভগবান ইন্দ্র তার সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে বলেছেন, হে স্তোতা আমি তােমার নিকটে এসেছি, আমায় দর্শন কর সমস্ত ভুবন কে আমরা মহিমা দ্বারা অভিভুত করি যজ্ঞের প্রদেগন আমাকে বর্ধিত করে, আমি বিদারনশীল ভূমি বিদীর্ণ করি।
(ঋগ্বেদ ৮/১০০/৪)"

শঙ্কার সমাধান– উপর্যুক্ত মন্ত্র দুইটির বিষয়ে শঙ্কা সমাধান করার জন্য কয়েকটি বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
১. অপপ্রচারকারীরা এই মন্ত্রদ্বয়ের অনুবাদ গ্রহণ করেছে রমেশচন্দ্রের অনুবাদিত ঋগ্বেদ থেকে, যার প্রকাশক হলো হরফ প্রকাশনী। যারা এই মন্ত্রে ঈশ্বরের সাকারত্ব প্রমাণ করার জন্য এই হরফের বেদ থেকে প্রমাণ দেয়, তারাই আবার মুসলিমদের সাথে বিতর্ক করার সময় হরফ প্রকাশনীর বেদ অনুবাদ মানে না, অস্বীকার করে। সেই অস্বীকারকৃত বেদ অনুবাদ থেকেই নিজেদের প্রমাণ প্রদর্শনের মতো হিপোক্রেসি আর কি বা হতে পারে!

সমীক্ষাঃ পাঠক, প্রথমে আলোচ্য বিষয়ে আমাদের মূল পোস্টটি দেখে আসুন ৷ পোস্টের লিঙ্ক ( http://vaishnavaism.blogspot.com/2018/03/beholding-God-by-vedic-seers.html?m=1 ) ৷মূল পোস্টে দেখতে পাবেন যে, আমরা কেবল রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদই দিইনি, সাথে শ্রীপাদ দমোদার সতবলেকর কৃত সুবোধ ভাষ্যেরও স্ক্রীণশর্ট দিয়েছি ৷ যেহেতু আমরা কেবল রমেশচন্দ্রের অনুবাদ নিয়ে পরে নাই, সেহেতু ১ নং আপত্তিটি অতি তুচ্ছ ৷

২. তাদের দেওয়া অনুবাদ অনুসারে যদি ঈশ্বরকে কেউ দেখেন নাই জন্য নেম ঋষি ঈশ্বরের অস্তিত্বে প্রশ্ন তোলে, তাহলে বলতে হয় নেম ঋষি বর্তমান দিনের নাস্তিকদের মতো! কিন্তু তা কখনই সম্ভব নয়। কারণ ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিরাই যেখানে উপনিষদে বলে গেছেন ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না, তখন সেই ঋষিই কিভাবে ঈশ্বরকে চোখে না দেখার জন্য ঈশ্বরের উপরে প্রশ্ন তুলতে পারেন? এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয় কি?

সমীক্ষাঃ ঋষি কি জন্ম থেকেই ঋষি হয়ে জন্মায়? নাকি সাধনা দ্বারা ঋষি হয়ে উঠতে হয়? ঋষিত্ব লাভ করার পূর্বে যদি কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে সেটা অপরাধ কিসের? আর ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিরা কি বলে গেছেন যে ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না? দেখুন উপনিষদে আছে- 

যত্তে রূপং কল্যাণতম তত্তে পশ্যামি ৷” (ঈশোপনিষদ, ১৬)
— যাহা তোমার কল্যাণতম রূপ তাহা আমি দেখি ৷

অজাত ইত্যেবং কশ্চিদ্ভীরুঃ প্রতিপদ্যতে।
রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যং।
 — “তোমাকে অজাত জেনে কেহ তোমার কাছে আসে আর তার চিত্ত ভয়ব্যাকুল হয় ৷ হে রুদ্র, হে ভীষণ, তোমার সেই যে অন্য হাস্যময় প্রসন্ন মুখমন্ডল, তার মধুর হাসি দিয়ে তুমি আমায় রক্ষা কর সর্বদা ৷” (শ্বেতাশ্বতর ৪/২১)

“সূর্যের অভ্যন্তরে যে পুরুষ দৃষ্ট হন তিনি হিরণ্যবর্ণ, তাহাঁর হিরণ্যশ্মশ্রু, হিরণ্যকেশ— নখাগ্র হতে সকল অঙ্গই সুবর্ণময় ৷” (ছান্দোগ্য ১/৬/৬-৭)

যদা পশ্যঃ পশ্যতে রূক্মবর্ণ কর্তারমীশং...’ (মুণ্ডুক ৩৷১৷৩)
— যখন দ্রষ্টা রূক্মবর্ণ জগতকর্তা পরমেশ্বরকে দেখেন... 

তদ্ধৈষাং বিজজ্ঞৌ তেভ্যো হ প্রাদুর্বভূব তন্ন ব্যজানত কিমিদং যক্ষমিতি ৷৷
                     //কেন উপনিষদ ৩/২।
সরলার্থ —ব্রহ্ম দেবতাদের মিথ্যা অভিমান জানিতে পারিয়া তাঁহাদের মঙ্গলার্থ তাঁহাদের সমীপে আবির্ভূত হইলেন। কিন্তু দেবগণ এই আবির্ভূত রূপ দেখিতে পাইয়াও ঐ পূজনীয় মূর্তিটি কে তাহা চিনিতে পারিলেন না।

সুতরাং উপনিষদ প্রমাণে ঈশ্বর সাকার এবং তিনি দর্শনযোগ্য ৷ তবে আমাদের চর্মচক্ষুর সামর্থ্য নেই তাঁকে দর্শন করার, কিন্তু ভগবান যাকে কৃপা করে দর্শন দিতে চান, তিনি তার চক্ষুকে ভগবানের রূপ দর্শন করার সামর্থ্য দিয়েই আবির্ভূত হন ৷

শ্রীভগবান গীতায় (১১/৮-৯) বলেছেন—
“হে অর্জুন, তুমি তোমার এই চর্মচক্ষুদ্বারা আমার এই রূপ দর্শনে সমর্থ হইবে না । এজন্য তোমাকে দিব্যচক্ষু দিতেছি, তদ্দারা আমার এই ঐশ্বরিক যোগসামর্থ্য দেখ । 
সঞ্জয় কহিলেন - হে রাজন্‌ মহাযোগেশ্বর হরি এইরূপ বলিয়া তৎপর পার্থকে পরম ঐশ্বরিক রূপ দেখাইলেন ।”
আর ভগবান যখন অবতাররুপে আসেন, তখন সর্বসাধারণের দর্শনযোগ্য শরীর গ্রহণ করেই আবির্ভূত হন ৷

কেন উপনিষদে দেখা যাচ্ছে যে, দেবতাদের মিথ্যা অহংকার দূর করতে ব্রহ্ম তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিল, তদ্রুপ ইন্দ্র নেম ঋষির সন্দেহ দূর করবার জন্য তার সামনে আবির্ভূত হয়েছিল -- এ সত্যকে নিরাকারবাদীরা সহজে স্বীকার করতে পারেনা, এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে???



৩. অপপ্রচারকারীদের সাথে মুসলিমদের হুবহু মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তারা সম্পূর্ণ সূক্ত বা সূক্তের শুরু থেকে মন্ত্র তুলে না দিয়ে মাঝ থেকে দুই একটা মন্ত্র তুলে দিয়ে নিজেদের মান্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এখানেও তেমন ঘটেছে। অপপ্রচারকারীরা এই মন্ত্রগুলোকে ঋষিবাক্য মানে। যদি এই সূক্তটা নেম ঋষিরই বাক্য হয়, তবে এই সূক্তের ১-২ মন্ত্র দেখলে স্পষ্ট দেখতে পারবেন সেখানে ইন্দ্রকে স্পষ্টভাবে স্তুতি করা হচ্ছে এবং ইন্দ্রকে নিজের সখা বলা হয়েছে! অর্থাৎ ৩য় মন্ত্রে যদি নেম ঋষি ঈশ্বরকে না দেখতে পাওয়ার জন্য অস্বীকার করতো, তবে ১ম ও ২য় মন্ত্রে তাঁকে এভাবে স্তুতি করা হতো না। অর্থাৎ অপপ্রচারকারীরা এখানে মুসলিমদের মতো আংশিক তথ্য প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে৷

সমীক্ষাঃ কত বড় মিথ্যাবাদীর দল দেখুন! আমরা নাকি কেবল মাঝ খান থেকে দু-একটা শ্লোক দিয়েছি ৷ কিন্তু আমাদের ব্লগের মূল পোস্টটিতে দেখতে পাবেন যে, সেখানে স্পষ্টত সূক্তটির প্রথম থেকে ৫নং মন্ত্র পর্যন্ত অনুবাদযুক্ত স্ক্রীণশর্ট দিয়েছি আমরা ৷
সূক্তটিতে নেম ঋষি প্রথম দুটি মন্ত্রে ইন্দ্রের স্তুতি করে, পরের দুটি মন্ত্রে উল্লেখ করেছেন যে, প্রথমে তিনি ইন্দ্রদেবের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তার সন্দেহ নিবারণের জন্যই ইন্দ্রদেব তাকে দর্শন দেন ৷ বেদে এই ঘটনার উল্লেখ দ্বারা দেবতাদের অস্তিত্বের সত্যতার প্রমাণ স্থাপন করা হয়েছে যাতে পরবর্তীতে কেউ নেম ঋষির মতো সন্দিহান না হয় ৷ আগে স্তুতি করে, পরে তাদের মধ্যকার ঘটে যাওয়া ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ৷

৪. অপপ্রচারকারীদের মতে, এই ৪র্থ মন্ত্রে ইন্দ্রের সাথে নেম ঋষির প্রত্যক্ষ কথোপকথন রয়েছে৷ অর্থাৎ তাদের মান্যতা মেনে নিলে বেদে ঋষির ইতিহাস আছে, এরূপ মানতে হয়। আর বেদে ইতিহাস থাকলে বেদ অনিত্য হয়ে যায়৷ অর্থাৎ তাদের এই দাবী সত্য হিসেবে মেনে নিলে এটি মানতে হবে যে, নেম ঋষির ইন্দ্রের সাথে পূর্বে ঋগ্বেদের ৮।১০০ সূক্তটির অস্তিত্ব ছিলো না। ফলে বেদের উপর অনিত্যতার দোষ আরোপিত হয়। কিন্তু আমাদের সনাতন শাস্ত্র বেদকে বলছে নিত্য এবং বেদে কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইতিহাস নাই। যেমন–
i. অতএব চ নিত্যত্বম্।। [বেদান্ত দর্শন– ১।৩।২৯]
অর্থাৎ এই কারণেই পরমাত্মা থেকে উৎপন্ন বেদ নিত্য।
ii. উক্তন্তু শব্দপূর্বত্বম্।। [মীমাংসা দর্শন– ১।১।২৯]
  • অর্থাৎ বেদরূপ শব্দ যে নিত্য তা আমরা পূর্বে বলে এসেছি। 

সমীক্ষাঃ বেদে অবশ্যই ইতিহাস আছে, বস্তুত বেদ হচ্ছে হিন্দুজাতির ইতিহাস ৷ আর ইতিহাস থাকলেই যে বেদকে নিত্য হবে না তা নয়, কারণ বেদ অর্থ জ্ঞান, বেদপুস্তকে যে জ্ঞান নিহিত আছে তা নিত্য, এইজন্য বেদকে নিত্য বলা যায় ৷ বেদে ইতিহাস আছে, সেই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, জ্ঞান আহোরণ করতে হবে ৷ ঋষিরা তাদের সাধনালব্ধ জ্ঞানকে বিভিন্ন ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটের সাথে উল্লেখ করেছেন ৷ যেমন- আলোচ্য নেম ঋষি ও ইন্দ্রদেবের প্রসঙ্গই ধরা যায়, নেম ঋষির ইন্দ্র দর্শন লাভের ঘটনা থেকে আমরা এই জ্ঞান লাভ করি যে, ঈশ্বর সত্য এবং তাঁর দর্শন লাভ করা সম্ভব ৷ 

আর আপনারা যে বেদান্তদর্শনের উল্লেখ করেছেন, সেই বেদান্তদর্শনেই দেবতাদের সাকারত্ব স্বীকার করা হয়েছে ৷
বেদান্ত-দর্শন—
“বিরোধঃ কর্ম্মণীতি চেন্নানেকপ্রতিপত্তের্দ্দর্শনাৎ”৷৷ ১/৩/২৭
(কর্ম্মণি) যজ্ঞাদি কার্য্যে (বিরোধঃ) এক সময়ে এক শরীরধারী দেবতার বহু স্থানে উপস্থিত থাকা-রূপ বিরোধ, অসম্ভবনা উপস্থিত হয় (ইতি চেৎ) এইরুপ যদি বলো? উত্তর:— (ন) না, তাহা বলিতে পারো না, অর্থাৎ দেবতাদের শরীর আছে, একথা বলিলেও কোন বিরোধ হয় না, যেহেতু (অনেকপ্রতিপত্তেঃ) একই দেবতা একই সময়ে অনেক শরীর ধারণ করিতে পারেন, (দর্শনাৎ) একথা শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ ইতিহাস সর্ব্বত্রই দেখা যায় ৷
অর্থাৎ—দেবতাগণের একই সময়ে অনেক দেহ ধারণের ক্ষমতা আছে ৷ এজন্য একই সময়ে বিভিন্ন যজ্ঞে উপস্থিত হওয়াতে বিরোধ হয়না ৷
যখন সামান্য যোগসিদ্ধ পুরুষগণই এককালে বহু শরীরধারণ করতে পারেন (যোগদর্শন ৪৷৪-৫ দেখুন), তখন তাহাদের উপরবর্তী দেবতাদের আর কথা কি? এবার ভাবুন তো, যখন সিদ্ধ যোগী ও দেবতাগণ একই সময়ে বহু শরীরধারণ করে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থাকতে পারেন, তখন সর্ব্বশক্তিমান পরমেশ্বর সাকার হইয়াও সর্বত্র বিরাজমান হওয়া অসম্ভব কি?

সুতরাং দেবতাদের সাকারত্ব স্বীকার করেই বেদান্তদর্শনে বেদকে নিত্য মেনেছে, এতে কোন বিরোধ নাই ৷

৫. বেদ যেহেতু নিত্য, তাই বেদে কোনো মানুষের নাম বা ইতিহাস থাকতে পারে না৷ কিন্তু "নেম" পদটি থাকায় এই পদটিকে নেম ঋষির সাথে গুলিয়ে ফেলে অপপ্রচারকারী দাবী করে যে এই মন্ত্রে নেম ঋষির ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বেদে যে নাম গুলো আছে সেগুলো কোনো ব্যক্তি বিশেষের নাম বা ইতিহাস নয়। এই বিষয়টি মীমাংসা দর্শনে [১।১।৩০–৩১] মহর্ষি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
আখ্যা প্রবচনাৎ।।৩০।।
পদার্থ– (আখ্যা) বেদে মধুচ্ছন্দাদি ঋষির নাম (প্রবচনাৎ) অধ্যয়ন অধ্যাপনার কারণে এসেছে।
অর্থাৎ বেদমন্ত্রের শুরুতে যেসব ঋষির নাম দেখা যায়, তাঁরা মূলত মন্ত্রের স্রষ্টা নন, বরং তাঁরা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করে এসব মন্ত্র দর্শন করেছেন এবং প্রচার করেছেন। ফলে তাঁদের নাম মন্ত্রের পূর্বে দেখা যায়।
পরন্তু শ্রুতিসামান্যমাত্রম্।।৩১।।
পদার্থ– (তু) বেদমন্ত্রে যেসব তুগ্র, ভুজ্যু, বশিষ্ঠ, কশ্যপ ইত্যাদি নাম পাওয়া যায়, সেগুলো (পরং) কেবল (শ্রুতিসামান্যমাত্রম্) শব্দ সামান্যমাত্র, কারও নাম নয়।
অর্থাৎ বেদ মন্ত্রের অভ্যন্তরে যেসব নাম দেখতে পাওয়া যায়, প্রকৃত পক্ষে সেগুলো কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়, সেগুলো শব্দমাত্র। যেমন– তুগ্র শব্দটি হিংসা অর্থে বর্তমান 'তুজি' ধাতুর সাথে 'রক্' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত। যার অর্থ হিংসক, বলবান বা গ্রহণকারী।

সমীক্ষাঃ দেখুন, আপনারাই লিখেছেন “বেদমন্ত্রের শুরুতে যেসব ঋষির নাম দেখা যায়,...” অর্থাৎ কেন বেদমন্ত্রের শুরুতে ব্যক্তিবিশেষেরই নাম থাকে, কিন্তু ঐ একই নাম সেই মন্ত্রমধ্যে থাকলে তখন পাল্টি খেয়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিহীন হয়ে যাবে কোন যুক্তিতে?? ঋগ্বেদ ৮/১০০ সূক্তের শিরোনামেই নেম ঋষির নাম, এর ৩নং মন্ত্রেও সেই নেম ঋষিরই নাম, আলাদা কোন নাম নয় ৷ আলাদা কোন নাম হলে তখন কেবল শব্দ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকত ৷


৬. তাহলে এখন প্রশ্ন হতে পারে ৩য় মন্ত্রে "নেম" অর্থ কী? এর সমাধানের জন্য আমাদের নিরুক্ত অনুসরণ করতে হবে৷ নিরুক্তের ৩।২০ এ বলা হয়েছে "নেম ইত্যর্ধস্য"। অর্থাৎ নেম হচ্ছে অর্ধেকের নাম। তাই নিরুক্তগত অর্থ অনুসারে এই ৩য় মন্ত্রে "নেম" কোনো ঋষি বিশেষের নাম নয়, বরং "নেম" অর্থ "অর্ধেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি"।

সমীক্ষাঃ “নেম” অর্থ "অর্ধেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি” ৷ তাহলে ইন্দ্রদেবের দর্শন তো কোন না কোন ব্যক্তিরই হচ্ছে !!
আর যাস্কমুনি তার নিরুক্তের প্রত্যেক ব্যাখ্যা কোন না কোন নির্দিষ্ট মন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে দিয়েছেন ৷ তিনি উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা মৈত্রায়নী সংহিতার (১৷১১৷৯) একটি মন্ত্রের ভিত্তিতে দিয়েছেন, মন্ত্রটি তিনি উল্লেখ করেছেন - “নেমে দেব নেমেহ’সুরাঃ ৷”
সুতরাং নেম অর্থ অর্ধ— এই ব্যাখ্যা ঋগ্বেদের ৮/১০০/৩ নং মন্ত্রের জন্য প্রযোজ্য নয় ৷

এছাড়া নিরুক্তেও যাস্ক দেবতাদের সাকারত্ব স্বীকার করেছেন ৷ চন্দ্র-সূর্য-অগ্নি প্রভৃতি যেসকল জড়বস্তু আমরা আমাদের স্থূল চক্ষুর দ্বারা দেখতে পাই, নিরুক্তে তাকে ‘অপুরুষবিধ’ দেবতা বলা হয়েছে এবং ঐসকল নামে উহার অধিষ্ঠাত্রী শরীরধারী চেতন দেবতাও আছে যাকে ‘পুরুষবিধ’ দেবতা বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ৷ (নিরুক্ত ৭/৬-৭ অংশ দেখুন) ৷

৭. এখন প্রশ্ন হতে পারে, যদি ইন্দ্র নেম ঋষির সামনে না এসে থাকেন, তবে ৪র্থ মন্ত্রে কেন পরমেশ্বর বললেন, "আমি তোমার সামনে রয়েছি, তুমি দেখো"। এর উত্তর হচ্ছে, ৬ নং পয়েন্ট থেকে আমরা জানলাম নেম অর্থ অর্ধ জ্ঞানী ব্যক্তি। আর যজুর্বেদ বলছে তিনি সর্বব্যাপক [যজু ৪০।১]। তিনি জ্ঞানীর অতিনিকটে কিন্তু অজ্ঞানীর থেকে তিনি অতিদূরে [যজু ৪০।৫]। জ্ঞানীগণ সর্বত্র ঈশ্বরকে দর্শন (অনুভব) করেন। [যজু ৪০।৬]
অর্থাৎ সর্বব্যাপক ও নিরাকার হওয়ায় ঈশ্বরকে কেউ দর্শন করতে পারে না। অর্ধজ্ঞানী ব্যক্তি ঈশ্বরকে দেখতে না পেয়ে ভাবে ঈশ্বর নেই। কিন্তু যখন সেই অজ্ঞানীর সামনে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে তখন তিনি ঈশ্বরকে সর্বভূতে দর্শন করেন, উপলব্ধি করেন।

 সমীক্ষাঃ ৬ নং পয়েন্ট খণ্ডিত হয়েছে ৷ তার পরেও প্রশ্ন করি যে, নেম যদি অর্ধজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিই হয়, তবে সেই অর্ধজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি ৩ নং মন্ত্রে ইন্দ্রের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করার পর হঠাৎ এত জ্ঞান সে কোথায় পেল যে ৪ নং মন্ত্রেই সে সর্বত্র ঈশ্বর দর্শন করতে লাগল???
৪নং মন্ত্রে ইন্দ্র বলছেন "আমি তোমার সামনে রয়েছি, তুমি দেখো"। কিন্তু আপনারা বলছেন, “ওহে বাপু! তুমি যতই সামনে এসে বসে থাকোনা কেন, আমি চোখ খুলব না, তেমায় দেখব না, শুধু অনুভব করব ৷ তুমি নিরাকার, তুমি বিদেয় হও!!” হাহাহা


৮. এবার ধারাবাহিক ভাবে ঋগ্বেদের ৮।১০০।১–৪ মন্ত্রের শুদ্ধ অনুবাদ পণ্ডিত হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারের ঋগ্বেদ ভাষ্য থেকে অনুবাদ করে দেওয়া হলো।
অয়ং ত এমি তন্বা পুরস্তাদ্বিশ্বে দেবা অভি মা যন্তি পশ্চাৎ।
যদা মহ্যং দীধ্রো ভাগমিন্দ্রাদিন্ময়া কৃণ্বো বীর্যাণি॥১॥
পদার্থ– জীব প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে যে, (অয়ম) এই আমি (তন্বা) এই শরীরের সাথে (তে পুরস্তাৎ) আপনার সামনে (এমি) উপস্থিত হয়েছি। (বিশ্বে দেবাঃ) সকল দেব (মা) আমার (পশ্চাদ্ অভিয়ন্তি) পিছে আসে। অর্থাৎ সব দিব্যগুণ আমায় প্রাপ্ত হয়। প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়ার কারণে সব দিব্যগুণ আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে৷ হে (ইন্দ্র) পরম ঐশ্বর্যবান প্রভু ! (যদা) যখন (মহ্যম্) আমার জন্য (ভাগং দীধরঃ) ভাগকে ধারণ করেন। আমায় যখন আপনার ভজনীয় গুণ প্রাপ্তি হয় (আৎ ইৎ) তখন শীঘ্রই (ময়া) আমার দ্বারা আপনি (বীর্যাণি কৃণবঃ) শক্তিশালী কার্য করেন৷ অর্থাৎ আমি আপনার মাধ্যম হয়ে যাই এবং আপনার শক্তি দ্বারা আমার কার্য হওয়া শুরু হয়।।১।।

সমীক্ষাঃ জীব প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে যে, (অয়ম) এই আমি (তন্বা) এই শরীরের সাথে (তে পুরস্তাৎ) আপনার সামনে (এমি) উপস্থিত হয়েছি।...... এখানে প্রশ্ন এই যে, প্রভু নিরাকার হলে স্বশরীরে তার সামনে কিভাবে উপস্থিত হয়?? তিনি সাকার না হলে তার সামনে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয় ৷

দধামি তে মধুনো ভক্ষমগ্রে হিতস্তে ভাগঃ সুতো অস্তু সোমঃ।
অসশ্চ্ ত্বং দক্ষিণতঃ সখা মেঽধা বৃত্রাণি জঙ্ঘনাব্ ভূরি॥২॥
পদার্থ– হে প্রভু ! (তে) আপনার (মধুনঃ) এই জীবনকে মধুর বানানো সোম (ভক্ষম্) ভোজনকে, শরীরের অভ্যন্তরে ধারণ করে (অগ্রে দধামি) সবার প্রথমে স্থাপিত করছি। আমি সোম রক্ষণকে নিজের মূল কর্তব্য বানাচ্ছি। (সুতঃ সোমঃ) শরীরে উৎপন্ন সোম (তে) আপনাকে প্রাপ্তির জন্য (হিতঃ ভাগঃ অস্তু) শরীরে ভজনীয় বস্তু সৃষ্টি হোক। সোম রক্ষণ দ্বারা আপনাকে প্রাপ্তকারী হবো। (চ) এবং হে প্রভু ! এই সোম রক্ষণ হওয়ার পর (ত্বম্) আপনি (মে) আমার (দক্ষিণতঃ সখা) ডান হাতের ন্যায় পূর্ণ বিশ্বসনীয় মিত্র (অসঃ) হয়ে থাকো। আপনাকে মিত্ররূপে পেয়ে (অধা) এখন (বৃত্রাণি) বৃত্ররূপ বাসনাকে (ভূরি জঙ্ঘনাব) উত্তমভাবে বিনষ্ট করবো।।২।।

প্র সু স্তোমং ভরৎ বাজয়ন্ত্ ইন্দ্রায়্ সত্যং যদি সত্যমস্তি।
নেন্দ্রো অস্তীতি নেম্ উ ত্ব আহ্ ক ঈং দদর্শ্ কম্ভি ষ্টবাম্॥৩॥
পদার্থ– (বাজয়ন্তঃ) শক্তিকে কামনা করতে থেকে তুমি (ইন্দ্রায়) সেই পরমৈশ্বর্যবান প্রভুর জন্য (স্তোয়ম্) স্তুতিকে (প্র সু ভরত) প্রকর্ষেণ সম্পাদিত করো। (সত্যং অস্তি) যদি প্রভু সত্য হয়, তবে তাঁর জন্য (সত্যম্) সত্যই স্তোমকে সম্পাদিত করো। (নেমঃ উ ত্বঃ) অর্ধজ্ঞান সম্পন্ন কোনো ব্যক্তি (ইতি আহ) এটি বলে যে (ইন্দ্রঃ ন অস্তি) পরমৈর্যবান প্রভু নেই। (কঃ ঈং দদর্শ) কে প্রভুকে দেখেছে ? (কং অভিষ্টবাম্) কার স্তবন করবো আমরা ? অর্থাৎ অপরিপক্ব জ্ঞানে এরকম প্রশ্ন ওঠে। ধীরে ধীরে তপস্যা রূপ অগ্নিতে জ্ঞান পরিপক্ব হয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি হলে এই সংসারের প্রত্যেক্ষ বস্তুতে প্রভুর সত্তার অনুভব হয়।।৩।।

সমীক্ষাঃ (কঃ ঈং দদর্শ) কে প্রভুকে দেখেছে
দেখুন, এখানে স্পষ্টত দেখার কথাই চলছে, অনুভবের নয় ৷

অয়মস্মি জরিতঃ পশ্য্ মেহ্ বিশ্বা জাতান্যভ্যস্মি মহ্না । ঋতস্য্ মা প্রদিশো বর্ধয়ন্ত্যাদর্দিরো ভুব্না দর্দরীমি ॥৪॥
পদার্থ– প্রভুর সত্তা বিষয়ে সন্দিগ্ধ স্তোতাকে প্রভু বলেন, হে (জরিতঃ) স্তোতা ! (অয়ং অস্মি) আমি তোমার সামনেই রয়েছি। (মা) আমায় (পশ্য) দেখো। এই জগতের প্রত্যেক পদার্থে আমার সত্তা দেখতে পারবে। (বিশ্বা জাতানি) সব উৎপন্ন পদার্থকে (মহ্না) নিজের মহিমা দ্বারা (অভ্যস্মি) অভিভূতকারী। (ঋতস্য প্রদিশঃ) সত্যের উপদেষ্টা ব্যক্তিগণ (মা বর্ধয়ন্তি) আমার বর্ধন করে। অর্থাৎ সত্যজ্ঞান প্রাপ্তকারী জ্ঞানীগণ প্রভুর মহিমা দেখতে থেকে তা সবার জন্য প্রতিপাদন করেন, বৃদ্ধি করেন। প্রভুর বলছেন যে (আদর্দিরঃ) সমন্তাৎ সকল ব্যক্তিকে বিদরণকারী হই। প্রলয়ের সময় আমিই (ভুবনা) সব ভুবনকে (দর্দরীমি) বিদির্ণ করি।।৪।। 

সমীক্ষা: প্রভুর সত্তা বিষয়ে সন্দিগ্ধ স্তোতাকে প্রভু বলেন, হে (জরিতঃ) স্তোতা ! (অয়ং অস্মি) আমি তোমার সামনেই রয়েছি। (মা) আমায় (পশ্য) দেখো। —এইটুকুতেও সম্পষ্ট যে, তিনি সাকাররুপে স্তোতার সামনে হাজির হয়েছেন ৷ কিন্তু পরে যে ভাষ্যকার লিখেছেন “এই জগতের প্রত্যেক পদার্থে আমার সত্তা দেখতে পারবে।” —ইহা তার মনগড়া উক্তি যা তিনি অতিরিক্ত বসিয়েছে কিন্তু মূল মন্ত্রের কোনো শব্দ হতে ইহা অনুমোদিত হয় না ৷

আর আপনাদের উল্লেখিত ভাষ্যকার হরিশরণ সিদ্ধান্তলংকারের ভাষ্যে হতেও দেখিয়ে দিচ্ছি যে ঈশ্বর সাকার ৷ দেখুন,

উত ত্বাবধিরং বয়ং শ্রুতকর্ণং সন্তমুতয়ে ৷
দূরাদিহ হবামহে ৷ (ঋগ্বেদ ৮/৪৫/১৭)
(উত) আর (বয়ং) আমি (দূরান্) দূর থেকেই—আপনার উপাসক না হওয়া সত্ত্বেও (ইহ) এই জীবনে (উতয়ে) রক্ষার নিমিত্ত (ত্বা) আপনাকে (হবামহে) আহ্বান করি ৷ সেই আপনাকে আমরা আহ্বান করি যিনি (অবধিরং) বধির নন ৷ (শ্রুতকর্ণং) শ্রবণ সমর্থ কর্ণযুক্ত ৷ যার কান সদা শ্রবণ করতে ব্যস্ত ৷ (সন্তম্) যিনি শ্রেষ্ঠ ৷
[হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার কৃত হিন্দী ভাষ্য হতে ভাষান্তরিত]

অপপ্রচারকারী আরও দাবী করে, মহর্ষি শৌনক এই সুক্ত প্রসঙ্গে বৃহদ্দেবতায় বলেছেন যে, "নেম বলেছিলেন ইন্দ্র বলতে কেউ নাই। এই কথা শুনে ইন্দ্র তার সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে দুইটি মন্ত্র দ্বারা নিজের স্তুতি করলেন। নেম ইন্দ্রকে দর্শন করে প্রসন্ন হন!(বৃহদ্দেবতা – ৬/১১৮–১১৯)
শঙ্কার সমাধান– আমাদের প্রদত্ত উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা ও মন্ত্রের অনুবাদ পড়লে বোঝা যাবে, বৃহদ্দেবতার মূলভাব বুঝতেও সেইসব অপপ্রচারকারীদের ভুল হয়েছে। আর এখানে উল্লেখ যোগ্য বিষয় হচ্ছে, বৃহদ্দেবতায় কি বলা হচ্ছে তা মন্ত্রের অর্থ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ এটি নিরুক্তের মতো বেদাঙ্গ অথবা শতপথাদি ব্রাহ্মণের মতো বেদের ব্যাখ্যান নয়। বরং এটি অনেক পরে রচিত একটি পরিশিষ্ট গ্রন্থ মাত্র। পরিশিষ্ট অনুসারে কখনই বেদের অর্থ করা যেতে পারে না। আর এই বৃহদ্দেবতায় উল্লেখিত "ইন্দ্র দুইটি মন্ত্র দ্বারা নিজের স্তুতি করলেন" এই বাক্য দ্বারা মূলত নিরুক্ত ৭/১–৩ এ উল্লেখিত পরোক্ষকৃত, প্রত্যক্ষকৃত ও আধ্যাত্মিক মন্ত্রের মধ্যে আধ্যাত্মিক মন্ত্রের উদাহরণ।

সমীক্ষাঃ মহর্ষি শৌনক কৃত বৃহদ্দেবতায় স্পষ্টত প্রমাণ রয়েছে যে, নেম ঋষির ইন্দ্রের দর্শনলাভ করেছিল ৷ কিন্তু নিরাকারবাদী ধূর্তগুলো তা মানবে কেন? সত্যকে গিলিয়ে খাওয়ালেও তারা মানবে না ৷ মানুষ বাঁচে আশায়, কিন্তু দয়ানন্দীরা বাঁচে শাস্ত্রের অপব্যাখ্যায় ৷

উপনিষদ, বেদান্তদর্শন, নিরুক্ত ও আর্যসমাজী হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারের ভাষ্য থেকে আমরা সাকারত্বের প্রমাণ দিয়েছি ৷ সুতরাং ঈশ্বর, দেবতা সকলই সাকার, এই হেতু তাঁদের দর্শন লাভও অসম্ভব কিছু নয় ৷ এক্ষণে আপনাদের শঙ্কার সমাধান হয়েছে তো??
---------------------------------------------

#প্রশ্ন: যিনি সর্বব্যাপক তিনি আবার সাকাররূপে প্রকটিত হতে পারে কিভাবে?

#উত্তর: প্রাকৃত অগ্নি (সূক্ষ্মাবস্থায়) সর্বত্র ব্যাপক রূপে থেকেও যখন কোন একটি স্থানে প্রকটিত হতে পারে এবং একস্থানে প্রকটিত হয়েও সেই অগ্নির অভাব যদি অন্য কোথাও না হয়, তাহলে প্রকৃতির অতীত যে ভগবান, যিনি অলৌকিক, যাঁর সমস্ত কিছু করার সামর্থ্য আছে, তিনি যদি সমস্ত জায়গায় ব্যাপকভাবে থেকেও একটি স্থানে প্রকটিত হন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই। অর্থাৎ অবতারত্ব গ্রহণ করলেও ভগবানের সর্বব্যাপকতা যেমন তেমনি থাকে।

//ওঁ শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু //

সাম্প্রতিক পোস্ট

পুরুষ—কৃষ্ণ ৷৷ প্রকৃতি—রাধা

 পুরুষ—কৃষ্ণ ৷৷ প্রকৃতি—রাধা ======================= যোগেনাত্মা সৃষ্টিবিধৌ দ্বিধারূপো বভূব সঃ ৷ পুমাংশ্চ দক্ষিণার্ধাঙ্গো বামাঙ্গঃ প্রকৃতিঃস্...

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ